একটি এআই ছবির পেছনে কতটুকু পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় হয়? জানলে অবাক হবেন!

একটি এআই ছবির পেছনে কতটুকু পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় হয়? জানলে অবাক হবেন!

AI উৎপাদিত ছবির পানি-বিদ্যুৎ খরচ

স্মার্টফোনে কয়েকটি শব্দ লিখে দিলেন, আর চোখের পলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তৈরি করে দিল এক দারুণ চমৎকার ছবি কিংবা আশির দশকের কোনো নস্টালজিক মুহূর্ত। কাজটা এখন এতটাই সহজ হয়ে গেছে যে, এর পেছনে প্রযুক্তিগত বা পরিবেশগত কোনো জটিলতা আছে কি না, তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামানোর সুযোগই পাই না।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আপনার ওই ছোট্ট একটি ‘কমান্ড’ বা নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পর্দার আড়ালে খরচ হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি ও বিদ্যুৎ? স্মার্টফোনে বসে আপনি যতই আরামদায়কভাবে এআই ব্যবহার করুন না কেন, এর বাস্তব মূল্য চাকাচ্ছে আমাদের এই পৃথিবী!

আপনার ফোন থেকে এআই কমান্ড দিলে আসলে কী ঘটে?

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—একজন মানুষ যখন নিজের ঘরে বসে স্মার্টফোনে এআই টুল ব্যবহার করছেন, তখন তাঁর তো এক ফোঁটাও পানি খরচ হচ্ছে না। তাহলে এআই কোম্পানিগুলো কেন বারবার পানির সংকটের কথা বলছে?

আসলে, আপনি যখন চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি কিংবা অন্য কোনো এআই টুলে লিখলেন—“পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যাস্তের একটি ছবি বানাও”—তখন সেই নির্দেশ ইন্টারনেট হয়ে সেকেন্ডের মধ্যে চলে যায় দূরের কোনো বিশাল ডেটা সেন্টারে। এই ডেটা সেন্টারগুলো হলো মূলত হাজার হাজার শক্তিশালী কম্পিউটারের বিশাল কারখানা। আপনার কাঙ্ক্ষিত ছবিটি তৈরি করে দেয় ওই সার্ভারগুলোই। আপনার হাতের ফোন বা ল্যাপটপের এখানে নিজস্ব কোনো বড় ভূমিকা থাকে না।

সার্ভার ঠান্ডা রাখতে কেন এত পানি লাগে?

হাজার হাজার সার্ভার যখন একসঙ্গে বসে কোটি কোটি জটিল হিসাব-নিকাশ করে, তখন সেগুলো প্রচণ্ড পরিমাণে গরম হয়ে ওঠে। ঠিকমতো তাপ অপসারণ করতে না পারলে এই দামি ও সংবেদনশীল যন্ত্রগুলো নিমিষেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

  • বাষ্পীভবন শীতলীকরণ পদ্ধতি (Evaporative Cooling): ডেটা সেন্টারগুলোকে ঠান্ডা রাখার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাষ্পীভবন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ব্যাপারটা আমাদের শরীর ঘামার মতো। গরম সার্ভারের পাশ দিয়ে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়, যা সার্ভারের তাপ শুষে নিয়ে নিজে গরম হয়ে যায়।

  • পানির অপচয় ও বাষ্পীভবন: এরপর সেই গরম পানি কুলিং টাওয়ারে পাঠানো হয়, যেখানে পানির একটি অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায় এবং বাকি পানি ঠান্ডা হয়ে আবার সার্ভারে ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি বাষ্প হয়ে নষ্ট হয়।

একটি ছবি তৈরিতে ঠিক কতটুকু পানি খরচ হয়?

গবেষণা ও প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকীগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এআই দিয়ে যেকোনো কনটেন্ট বা ছবি তৈরিতে পানির খরচ বেশ উদ্বেগজনক:

  • ছবি বা লেখা তৈরিতে খরচ: বিভিন্ন জ্বালানি ও উপাত্তের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি সাধারণ এআই ছবি বা জটিল প্রম্পট তৈরিতে গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার পর্যন্ত পানি খরচ হতে পারে।

  • একটি ডেটা সেন্টারের হিসাব: ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইইএসআই-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১১ কোটি গ্যালন পানি খরচ করে, যা প্রায় এক হাজার পরিবারের সারা বছরের পানির চাহিদার সমান! আর বড় ডেটা সেন্টারগুলোয় দিনে ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি লাগতে পারে।

এই পানি আসলে কোথায় থেকে আসে?

ডেটা সেন্টারগুলো তাদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে স্থানীয় সরবরাহ লাইন, নদী বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। এই পানির বড় অংশই হলো সুপেয় বা পানের উপযোগী মিঠাপানি। ফলে গ্রীষ্মকালে বা শুষ্ক মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন ব্যবহার এবং কৃষিকাজের জন্য বরাদ্দ পানির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়।

সমালোচনার মুখে পড়ে মাইক্রোসফট, গুগল ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। যেমন—মাইক্রোসফট সিঙ্গাপুরে তাদের ডেটা সেন্টার চালাতে প্রায় ৯৯ শতাংশই পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার করছে। অ্যামাজনও ২০৩০ সালের মধ্যে ১২০টির বেশি ডেটা সেন্টারে বর্জ্যপানি ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে।

সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টারের অভিনব ভাবনা

সুপেয় পানির ওপর থেকে চাপ কমাতে এবং ঠান্ডা রাখার খরচ বাঁচাতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সমুদ্রের দিকে তাকাচ্ছে। সমুদ্রের পানি বিনা মূল্যে পাওয়া যায় এবং এটি প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা।

  • প্রজেক্ট নেটিক ও চীনের উদ্যোগ: মাইক্রোসফট অতীতে সমুদ্রের নিচে ‘প্রজেক্ট নেটিক’ নিয়ে কাজ করলেও রক্ষণাবেক্ষণের জটিলতায় তা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। তবে চীন এই ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। চীনা প্রতিষ্ঠান হাইল্যান্ডার হেইনান দ্বীপের উপকূলে সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটা সেন্টার চালু করেছে।

  • পদ্ধতি: সমুদ্রের ঠান্ডা পানি সরাসরি যন্ত্রের সংস্পর্শে না এসে সিল করা বাক্সের বাইরের আবরণ দিয়ে তাপ শুষে নেয়। ফলে বাষ্পীভবন ছাড়াই সার্ভার ঠান্ডা থাকে এবং কোনো সুপেয় পানির অপচয় হয় না।

বিদ্যুৎ বনাম পানি: বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রযুক্তি দুনিয়ায় একটি জনপ্রিয় প্রবাদ রয়েছে—“বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি খরচ হয়, আর পানি বাঁচাতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি পোড়ে।”

বিকল্প হিসেবে ‘ক্লোজড-লুপ’ বা ‘ইমারশন কুলিং’ (তরলে ডুবিয়ে রাখা) পদ্ধতি আনা হলেও, সেখানে পানি বাষ্প হয়ে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে ওই গরম তরলকে ঠান্ডা করতে বিশাল আকৃতির এসি বা শক্তিশালী বৈদ্যুতিক পাখা (চিলার) চালাতে হয়, যা প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ টানে। এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক পরিবেশবান্ধব ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন প্রকৌশলীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. এআই ছবি বা প্রম্পট ব্যবহার করলে পানি খরচ হয় কেন?

উত্তর: এআই ডেটা সেন্টারের হাজার হাজার সার্ভার কাজ করার সময় প্রচুর গরম হয়ে যায়, যা ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি ব্যবহার করতে হয়।

২. একটি এআই ছবি তৈরিতে গড়ে কতটুকু পানি খরচ হয়?

উত্তর: বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি ছবি তৈরিতে গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার পানি খরচ হতে পারে।

৩. ডেটা সেন্টারের পানি কেন বারবার রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা যায় না?

উত্তর: পানি বাষ্প হওয়ার পর পানিতে থাকা খনিজ ও লবণের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এই খনিজযুক্ত পানি বারবার ব্যবহার করলে পাইপ ও যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি হয়।

৪. সাধারণ গুগল সার্চের তুলনায় এআই ব্যবহারে কি বেশি পানি লাগে?

উত্তর: হ্যাঁ, একটি সাধারণ গুগল সার্চে যেখানে শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৬ মিলিলিটার পানি লাগে, সেখানে এআই ব্যবহারে বহুগুণ বেশি পানি খরচ হয়।

৫. মাইক্রোসফট বা অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কী সমাধান খুঁজছে?

উত্তর: তারা সুপেয় পানির পরিবর্তে বাসাবাড়ির পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ওয়াটার পজিটিভ’ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

৬. সমুদ্রের তলদেশের ডেটা সেন্টার কীভাবে কাজ করে?

উত্তর: সমুদ্রের ঠান্ডা পানি সরাসরি যন্ত্রের সংস্পর্শে না এসে সিল করা বাক্সের বাইরে দিয়ে কেবল তাপ শুষে নেয়, ফলে কোনো পানির অপচয় হয় না।

৭. চীন কোথায় পানির নিচের ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে?

উত্তর: চীন তাদের হেইনান দ্বীপের উপকূলে সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে এই বাণিজ্যিক ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে।

৮. ক্লোজড-লুপ (Closed-loop) কুলিং সিস্টেম কী?

উত্তর: এটি এমন একটি বদ্ধ প্রণালী যেখানে তরল বা পানি বদ্ধ পাইপের ভেতর দিয়ে ঘোরে এবং বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায় না।

৯. ইমারশন কুলিং (Immersion Cooling) প্রযুক্তিটি কেমন?

উত্তর: এই পদ্ধতিতে পুরো সার্ভারটিকেই বিদ্যুৎ-অপরিবাহী বিশেষ একধরনের রাসায়নিক তরলে পুরোপুরি ডুবিয়ে রাখা হয়।

১০. পানি সাশ্রয় করতে গেলে কোন বড় সমস্যা তৈরি হয়?

উত্তর: পানি বাষ্প করা বন্ধ করলে সেই তাপ সরানোর জন্য বিশাল আকৃতির এসি ও কুলিং সিস্টেম চালাতে হয়, যা প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ খরচ করায়।

আপনার যদি কোনো বিষয় জানার থাকে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। এইরকম আরো ইন্টারেস্টিং আনকমন সকল বিষয়ের তথ্য জানতে আমাদের  ব্লগ  ওয়েবসাইট (বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্লগ) TrickBD Free ( www.TrickBDFree.com ) এর সঙ্গেই থাকুন ।পোস্টে কোথাও ভুল ক্রুটি হলে ক্ষমা করবেন ধন্যবাদ আল্লাহ হাফেজ।৷

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url